প্রকৃতির কাছে পরাজয়

প্রকৃতি যখন বেপরোয়া হয়ে ওঠে, তখন মানে না কোনো বিজ্ঞান, দুর্ঘটনার আগে মেলে না কোনো পূর্বাভাসের হিসাব-নিকাশ। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সর্বাধিক আঘাতপ্রাপ্ত দেশের নাম জাপান। সেই জাপানের কুশু ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক আশির আহমেদ ভিন্ন চোখের এবারের প্রধান প্রতিবেদন লিখেছেন।
সম্প্রতি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট ফেসবুকে একটা খবর শেয়ার করলেন। একটা প্রতিযোগিতার খবর। উনি বিচারকের দায়িত্বে ছিলেন। প্রথম পুরস্কার যে পেল তার আবিষ্কারটি ছিল একটা বিশেষ পাম্প। এই পাম্প আপনার পানির ট্যাপে লাগিয়ে নিলে নলের মধ্যে আটকে থাকা পানি টুকু বের করতে পারবেন।
তো, এতে আবিষ্কারের ব্যাপারটি কোথায়?
এরকম একটা সিনারিও কল্পনা করুন। ভূমিকম্প জাতীয় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে আপনার বাড়িটি ধসে গেছে। আপনি ভিতরে জীবিত আটকা পড়েছেন। বাইরের সাহায্য ছাড়া বের হতে পারছেন না। একটু হলেও বেশি সময় বেঁচে থাকা চাই। বেঁচে থাকার জন্য অনেক কিছুই জরুরি, তবে সবচেয়ে জরুরি হলো মনোবল আর খাবার। বিশেষ করে পানি। এখন প্রশ্ন হলো বাইরে থেকে মনোবল, পানি এগুলো সাপ্লাই কে দেবে কীভাবে দেবে?
পানির পাইপলাইন নেটওয়ার্ক ভেঙে গিয়ে আপনার ঘরের পানি সরবরাহ বন্ধ। আপনার একমাত্র সম্বল হলো ট্যাপের নলে আটকে থাকা পানিটুকু। এখন এই পানিটুকু বের করা চাই। ছেলেটির আবিষ্কারটি এখানেই। আপনার ট্যাপের সাথে লাগানো থাকবে এই ক্ষুদ্র পাম্পটি। এই পাম্পটি থাকার কারণে আপনি হয়তো কয়েক মিনিট, কয়েক ঘণ্টা, কয়েকদিন বেশি বেঁচে থাকতে পারবেন। ছুটির ঘণ্টা ছবিটির ছেলেটির কথা মনে আছে?
জাপানে একটি করে দুর্যোগ হয়, আর সেখান থেকে শিখে পরবর্তীটাকে মোকাবেলা করে। ১৯২৩ সালে টোকিওতে ভূমিকম্প হলো। মাত্রা ৭.৯। মানুষ মরল ১ লাখ ৫,৩৮৫ জন। এরমধ্যে কতজন আগুনে পুড়ে মরেছে জানেন? ৯১ হাজার ৭৮১ জন। বুঝলেন দাদা, ৯০% এর কাছাকাছি। তখন জাপানে কাঠের ঘর বাড়ি বেশি ছিল। গবেষকরা নেমে পড়লেন। আগুনের উত্পত্তিস্থলগুলো খুঁজে বের করে তা বন্ধ করার ব্যবস্থা করলেন। যেমন প্ল্যান তেমন কাজ। বিরোধী দল বাধা দিল না। পরবর্তীতে ক্ষমতায় এসে এই প্রজেক্ট বন্ধও করল না। প্রত্যেকটি গ্যাস মিটারের সাথে লাগানো হলো একটা সিস্মো-সেন্সর। ভূমিকম্প টের পেলেই একটি ভাল্ব গ্যাস পাইপের মুখ আটকে দেয়। গ্যাসের চুলার মধ্যেও লাগানো হলো নতুন প্রযুক্তি।
১৯৯৫ সালের ভূমিকম্প হলো কোবে শহরে। মাত্রা ছিল ৬.৯। সর্বমোট মানুষ মারা গেল ৬ হাজার ৪৩৪ জন। এর মধ্যে পুড়ে মরেছে কত জানেন? এর সংখ্যা এতই নগণ্য যে কোথাও তার উল্লেখ নেই। অপ্রয়োজনীয় মৃত্যুগুলো টেকনোলজি দিয়ে আটকে দিল। টেকনোলজি ফর দ্য পিপল বাই দ্য পিপল।
কিন্তু ১৯৯৫ সালের ভূমিকম্প গবেষকদের চোখ কেড়েছে অন্য দিকে। ৪ লাখ বিল্ডিং ক্ষতিগ্রস্ত হলো। ফ্লাইওভারগুলো ধসে পড়ে রাস্তা ব্লক হয়ে গেল। অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে সময়মতো পৌঁছতে পারল না। জীবিত আটকে পড়া মানুষগুলো মরল ভয়ে, ঠাণ্ডায়, খাবারের অভাবে, পানির অভাবে।
আর্কিটেক্ট, সিভিল ইঞ্জিনিয়াররা নেমে পড়লেন। নতুন করে বিল্ডিং কোড তৈরি করলেন। লক্ষ্য করলেন, যে বিল্ডিংগুলো ধসে পড়েছে তার অধিকাংশই ৬০ সালের আগের কোডে তৈরি করা। ভূমিকম্প-প্রুফ বিল্ডিং কোড ১৯৮১ সালে রিভাইস করা হয়েছিল কিন্তু সর্বত্র প্রয়োগ করা হয়নি। পুরোনো বিল্ডিংগুলো ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্পের ধাক্কা সইতে পারল না।
২০১১ সালের ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৯.১। টোকিও শহরে আফটার শকগুলোও ছিল ৭.৯-এর উপরে। উল্লেখ করার মতো বিল্ডিং ধসে পড়ার কোনো খবর শুনিনি। টোকিও শহরে মৃত্যুর সংখ্যা শূন্য। টেকনোলজি দিয়ে লক্ষ লক্ষ মৃত্যু আটকে দিল। সাবাস আর্কিট্যাক্টস, সাবাস সিভিল ইঞ্জিনিয়ারস। টেকনোলজি ফর দ্য পিপল বাই দ্য পিপল।
১৯৯৫ সালের কোবে ভূমিকম্প নিয়ে সব ডিসিপ্লিনের গবেষকরা নেমে পড়লেন। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার থেকে শুরু করে মনস্তত্ত্ববিদ। চোখ নড়বড়ে করে দেওয়ার মতো পর্যবেক্ষণ আর নব নব আবিষ্কার। পানির ট্যাপ নিয়ে শুরু করেছি, ট্যাপের কাহিনিটুকুই বলি।
একসময় পানির ট্যাপ খোলা আর বন্ধ করা হতো একটা নব ঘুরিয়ে। গরম পানি ঠাণ্ডা পানির জন্য ছিল আলাদা আলাদা ট্যাপ। নব ঘুরে দুই দিকে। চারটা ফাংশন (খোলা, বন্ধ, গরম পানি, ঠাণ্ডা পানি) একটা টু-ডিরেকশনাল নব দিয়ে কন্ট্রোল করা সম্ভব নয়। আবিষ্কার হলো এক ধরনের লম্বা লিভার (দণ্ড)। এই লিভারে চারটা ফাংশন। লিভারটাকে নিচে নামালে পানি পড়ে, ওপরে ওঠালে বন্ধ। ডান দিকে ঠাণ্ডা পানি বাম দিকে গরম পানি। কিন্তু ভূমিকম্পের ব্যাপারটি আমলে আনা হয়নি।
কোবে ভূমিকম্প থেকে একটা পর্যবেক্ষণ হলো—ভূমিকম্পে উপর থেকে জিনিসপত্র পড়ে লিভারে লাগলে পানি পড়তেই থাকে, ঝরতেই থাকে। এটা বন্ধ করার জন্য কোনো রকেট বিজ্ঞান লাগে না। শুধু লিভারটার ফাংশনটা উল্টো করে দিলেই হলো। উপরের দিকে ওঠালে পানি আসবে, নিচে নামালে বন্ধ। ১৯৯৫- এর পর নতুন ট্যাপ-নীতিমালা তৈরি হলো। জাপানের বাসাবাড়ির ট্যাপগুলো উপর-নিচ-ডান-বাম করে দেখেন।
এবারের ছাত্রটির পাম্প আবিষ্কার জাপানের ট্যাপ টেকনোলজিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল। ছোট একটা কাজ, কত বড় ইমপ্যাক্ট, কতগুলো প্রাণ বাঁচতে পারে উপলব্ধি করতে পারছেন? টেকনোলজি বাই দ্য পিপল ফর দ্য পিপল।
পৃথিবীতে ম্যানহোল তৈরি হয়েছে মানুষ গর্তে ঢুকে মেনন্টেনেন্সের কাজ করার জন্য। শিশু পড়ে মরার জন্য নয়। দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। তবে উদ্ধারের প্রযুক্তি আমাদেরই তৈরি করতে হবে। গত ডিসেম্বরে জিয়াদ, এই ডিসেম্বরের নীরবের অপ্রয়োজনীয় মৃত্যু আমাদের অনেককেই সরব করেছে। সরকারও হয়েছে। এখন দরকার সরকারকে প্রযুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে আরও সাহায্য করা। সংশ্লিষ্ট লোকজনদের এম্পাওয়ার করা।
(১) একটা প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা করতে চাই। তরুণরা এগিয়ে আসুক।
জিয়াদের ঘটনাটি হোক একটা উপাখ্যান। একটা ছেলে ম্যানহোলে পড়ে গেছে বলে মানুষ বলছে। নিম্নলিখিত সমস্যাগুলোর বিজ্ঞানসম্মত সমাধান দাও—(ক) ম্যানহোলে কি আসলেই শিশু আছে, কীভাবে ডিটেক্ট করবে? (খ) কত দূরত্বে আছে, কীভাবে পরিমাপ করবে? (গ) অল্প সময়ে, কোন ধরনের শারীরিক আঘাত না করে কীভাবে তোলা যাবে? (ঘ) গর্তে পড়া শিশুটির সাথে কীভাবে যোগাযোগ করবে? (ঙ) কীভাবে খাবার পাঠাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। এই টেকনোলজিগুলো আবিষ্কার করা, দমকল বাহিনীকে ট্রেইন করা হতে পারে তার পরবর্তী কাজ।
পুরস্কার হোক জাপানে এসে এদের ইমার্জেন্সি সার্ভিসগুলো পরিদর্শন করার সুযোগ।
(২) আমাদের অন্যান্য সমস্যাগুলোরও একটা লিস্ট করতে চাই। একেকটা সমস্যা নিয়ে একেকটা প্রতিযোগিতা হোক। প্রতি বছর হোক না ৩টা ৪টা প্রতিযোগিতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা গবেষণার টপিক হিসেবে নেবে একটা করে সমস্যা। তৈরি হবে একটা ভিন্ন ধরনের আর্কাইভ। ‘আমাদের সমস্যা আমাদের সমাধান’।
একদিন জাপানিরা ও একই ধরনের প্রতিযোগিতার আয়োজন করবে। পুরস্কার হবে বাংলাদেশে গিয়ে ‘আমাদের সমস্যা আমাদের সমাধান’ পরিদর্শন।

লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, কুশু বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *