ধেয়ে আসছে একের পর কিমের ক্ষেপণাস্ত্র, ত্রাস জাপানে

শক্তপোক্ত ছাদের তলায় মাথা গুঁজুন। অথবা আশ্রয় নিন মাটির নিচের ঘরে।
তিন সপ্তাহে দু-দু’বার দেশের উপর দিয়ে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উড়ে যাওয়ায় পর জাপানবাসীকে এ ভাবেই আত্মরক্ষা করার পরামর্শ দিচ্ছে টোকিও সরকার। কিন্তু সমস্যা হলো, ভূমিকম্পপ্রবণ জাপানে বহু বাড়িই কাঠের। যেগুলিতে মাটির তলায় ঘরই নেই। গ্রামের দিকে তো সিমেন্টের বাড়ি প্রায় দেখাই যায় না। ফলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে বুঝলেই ‘নিরাপদ’ স্থানে লুকোনোর পরামর্শ অর্থহীন ঠেকছে বহু মানুষের কাছে।

গত মাসে উত্তর-পূর্ব জাপানের হোক্কাইডো প্রদেশের উপর দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল উত্তর কোরিয়া। সপ্তাহ না কাটতেই চলতি মাসের শুরুতে ফের হাইড্রোজেন বোমা পরীক্ষা করে কিম জং উনের দেশ। যার জেরে পিয়ংইয়ংয়ের উপরে নিষেধাজ্ঞা চাপায় রাষ্ট্রপুঞ্জ। তাতে আরও খেপে উঠে পরমাণু বোমায় জাপানের ৪টি দ্বীপ ডুবিয়ে দেওয়ার হুমকি দেয় পিয়ংইয়ং। সেই হুঙ্কার যে ফাঁপা নয় তার প্রমাণও মিলেছে গত কাল। রাজধানীর উত্তরে সুসান বিমানঘাঁটি থেকে ফের একটি মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করা হয় শুক্রবার সকালে। জাপানের উপর দিয়ে গিয়ে যা প্রশান্ত মহাসাগরে পড়ে। ফলে কিমের রোষে পড়ে যুদ্ধের সিদুঁরে মেঘ দেখছে হিরোশিমা-নাগাসাকির আতঙ্ক বুকে নিয়ে বাঁচা জাপান।
সেই আতঙ্কের ছায়া ইসামু ওয়ার চোখেমুখে। জাপানের এরিমো শহরে একটি রেস্তোরাঁ পরিচালনা করেন বছর সত্তরের ইসামু। এই ছোট্ট জনপদটির উপর দিয়েই শুক্রবার উড়ে গেছে কিমের ক্ষেপণাস্ত্র। ‘‘সরকার বলছে পোক্ত বাড়িতে লুকোতে বা মাটির তলায় আশ্রয় নিতে। কিন্তু কোথায় পাব সেই রকম মাথা গোঁজার জায়গা?’’ প্রশ্ন অসহায় প্রৌঢ়ের।

হামেশাই ছোট-বড় ভূকম্পন ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে অভ্যস্ত জাপান সদা-তৎপর এগুলির মোকাবিলায়। ভূমিকম্পের হাত থেকে বাঁচার উপায় শিখিয়ে থাকে স্থানীয় প্রশাসন ও স্কুল। এ বারে শেখানো হচ্ছে ক্ষেপণাস্ত্রের হাত থেকে অত্মরক্ষার উপায়ও। গত মাসে হোক্কাইডো প্রদেশের উপর দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র উড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রেডারে ধরা পড়ে বিপদসঙ্কেত। লাউডস্পিকারে সতর্ক করে দেওয়া হয় মানুষকে। বন্ধ হয়ে যায় টেলিভিশনের অনুষ্ঠান। এসএমএস করে সাবধান করে দেয়া হয় সবাইকে।

যদিও এ সবে মোটেই আশ্বস্ত হতে পারছেন না জাপানবাসীরা। গত সপ্তাহে এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, কিমের ক্ষেপণাস্ত্রের ভয়ে কাঁটা হয়ে আছেন দেশের অন্তত ৫২% মানুষ। ৩৩% জানিয়েছেন, আতঙ্ক থাকলেও তা মারাত্মক কিছু নয়। আর নির্ভয়ে রয়েছেন সাকুল্যে ২%। উত্তর কোরিয়ার টক্কর নিতে এ বছর প্রতিরক্ষা খাতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ করেছে জাপান। তবু আতঙ্কে সাবেক সরকারি কর্মী মাচিকো ওয়াতানাবে। তার কথায়, ‘‘ভয়ে গুটিয়ে যাচ্ছি। জানি না কীভাবে নিজেদের এই বিপদ থেকে বাঁচাবো?’’

আতঙ্কের মুখে সকলে অবশ্য হাত গুটিয়ে বসে নেই। ক্ষেপণাস্ত্র থেকে বাঁচতে মজবুত আশ্রয় বানাচ্ছেন কেউ কেউ। ফলে চাহিদা বাড়ছে ওরিবো সেইসাকুসোর মতো আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারদের।

তিনি জানাচ্ছেন, যারা নতুন বাড়ি বানাচ্ছেন তারা এবং অনেক ক্ষেত্রে নতুন তৈরি হওয়া অফিস বা কারখানাগুলোর কাছে কর্মীদের সুরক্ষার জন্য আশ্রয় বানাচ্ছে মালিকপক্ষ। তবে সংখ্যায় তা খুবই কম। কারণ, হিসেব বলছে প্রায় চার মাস ধরে আড়াই লাখ ডলার খরচ করে যেগুলি তৈরি হচ্ছে, তাতে আঁটতে পারেন মেরেকেটে ১৩ জন।

এর মধ্যেও দিব্যি নিশ্চিন্তে অনেক টোকিওবাসী। ২১ বছরের ওয়েব ডিজাইনার কেন তানাকা যেমন বলছেন, ‘‘আমার মনে হয় না টোকিও বা রাজধানীর কাছেপিঠে কোনো এলাকায় আক্রমণ করার সাহস পাবে উত্তর কোরিয়া।’’ তবে তানাকাদের সংখ্যা নেহাতই হাতে গোণা।

উ.কোরিয়ার চূড়ান্ত লক্ষ্য কী?
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন তার দেশের সামরিক শক্তিকে আমেরিকার সম-অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ উত্তর কোরিয়ার সর্বশেষ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের কঠোর নিন্দা জানানোর পরপরই এ অঙ্গীকার করেন তিনি।

কিম জং-উনের বরাত দিয়ে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা কেসিএনএ এ খবর জানিয়েছে। তিনি বলেছেন, “সামরিক শক্তিতে আমেরিকার সম-অবস্থানে পৌঁছানো হচ্ছে আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য যাতে মার্কিন শাসকরা আর কখনো উত্তর কোরিয়ায় সামরিক হামলার হুমকি দেয়ার ধৃষ্টতা না দেখায়।”

উত্তর কোরিয়ার নেতা বলেন, শুক্রবার তার দেশের পক্ষ থেকে নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র নিখুঁতভাবে তার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। পিয়ংইয়ংয়ের বিরুদ্ধে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা দেয়া সত্ত্বেও দেশের পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচিকে পরিপূর্ণতা দেয়ারও ঘোষণা দেন কিম জং-উন।

শুক্রবার উত্তর কোরিয়া জাপানের উপর দিয়ে মাঝারি-থেকে-দূরপাল্লার হুয়াসং-১২ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। ওই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের কয়েক ঘণ্টা আগে জাপানকে ‘সাগরে ডুবিয়ে’ দেয়ার হুমকি দিয়েছিল পিয়ংইয়ং।

ক্ষেপণাস্ত্রটি আকাশে উড্ডয়নের পর জাপানের কর্মকর্তারা নিয়মিত টেলিভিশন অনুষ্ঠান বন্ধ করে হোক্কাইদো দ্বীপের অধিবাসীদেরকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং জনগণ সে আহ্বানে সাড়া দেয়। কিন্তু ক্ষেপণাস্ত্রটি হোক্কাইদো দ্বীপে আঘাত হানার পরিবর্তে এর আকাশ দিয়ে উড়ে যায় এবং দ্বীপটিকে অতিক্রম করে আরো ২,২০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সাগরে পতিত হয়।

গত রাতেই জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ এক জরুরি বৈঠকে বসে ওই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানালেও নতুন করে কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়নি।

সূত্র: নয়া দিগন্ত অনলাইন, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭,

Tags: , ,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *