জরুরি অবস্থাও জাপানিদের ঘরে রাখতে পারছে না!

নভেল করোনাভাইরাস মোকাবেলায় প্রথমবারের মত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে জাপান। তিন দিন আগে প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে মানুষজনকে ঘরে রাখতে সাতটি প্রদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। কিন্তু জরুরি অবস্থা আদৌও কাজে দিচ্ছে কি?

জরুরি অবস্থার পর কিংবা আগের পার্থক্য খুঁজে পাচ্ছেন না জাপানিরা। একই কথা জানিয়েছে প্রবাসী বাঙালিরাও। দিনের কর্মঘণ্টা কমানো হলেও যানবাহন, অফিস-আদালত, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চলছে আগের মতোই।

ট্রেন স্টেশন, বাসস্ট্যান্ডে আগের চেয়ে কিছু যাত্রী কমলেও ভিড় কমেনি।

এ পরিস্থিতিতে শুক্রবার টোকিওর গভর্নর ইউরিকো কইকে এক সংবাদ সম্মেলনে দেশটির রেস্তোরাঁ ও বারগুলোকে ভোর ৫ টা থেকে রাত ৮ পর্যন্ত খোলা রাখতে অনুরোধ করেছেন। এছাড়া সন্ধ্যা ৭টার পর অ্যালকোহল বিক্রি বন্ধ করার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। 

মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে সাতটি প্রদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার পর থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশনা মানার দায়িত্ব দিয়েছিলেন স্থানীয় গর্ভনরদের।

কিন্তু গত কয়েকদিনে দেশটির গণমাধ্যমে জরুরি অবস্থা না মানার কঠোর সমালোচনা এসেছে। মানুষজনকে গৃহমুখী করতে স্থানীয় প্রশাসন ব্যর্থ হচ্ছেন বলে মনে করছেন অনেকে।

কেবল ‘অনুরোধ’ করতে পারেন সরকার

বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যন্য দেশে জরুরি অবস্থায় মানুষজনকে ঘরে রাখতে আইনের প্রয়োগে কঠোরতা থাকলেও জাপানের আইনে তেমনটা করতে পারেন না সরকার। দেশের জনগণকে কেবল ’অনুরোধ’ জানাতে পারবে স্থানীয় প্রশাসন।

২০২০ সালের মার্চের শুরুতে দেশটির সংসদে ৫২/১ ধারা অনুযায়ী ’জরুরি অবস্থা জারি’ আইন পাস হলেও এই আইনটি তারও আগে ২০১২ সালে করা হয়েছিল। ২০০৯ সালের দিকে ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীর অভিজ্ঞতা থেকে তিন ধরণের সংক্রামক রোগ রুখতে রাষ্ট্রীয় জরুরি অবস্থা জারির ওই আইনটির কথা আলোচনায় এসেছিল।

২০১৯ ডিসেম্বেরে চীনের উহানে নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রায় ১৫ দিন পর ২০২০ সালে ১৪ জানুয়ারি জাপানে প্রথম কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী ধরা পড়ে। ফেব্রুয়ারি থেকে সরকারি পর্যায়ে জরুরি অবস্থা জারি নিয়ে কথা শুরু হওয়ার পর ৫ মার্চ সংসদে সর্ব সম্মতিক্রমে জরুরি অবস্থার বিল পাস হয়।

গত ২৪ মার্চ টোকিও অলিম্পিক গেইম স্থগিত হওয়ার পর থেকে দেশটিতে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী বাড়তে থাকে। পাশাপাশি বাড়তে থাকে মৃতের সংখ্যা।

এই প্রেক্ষিত্রে ওই বিলটি পাসের প্রায় এক মাস পর ৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। এর মধ্য দিয়ে জাপান প্রথমবার এই আইনটি প্রয়োগের সুযোগ পায়।

জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে আবে বলেছিলেন, “সমগ্র দেশজুড়ে করোনাভাইরাসের প্রকোপ আমাদের জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করেছে। অনেক প্রাণহানিও ঘটাচ্ছে। এই প্রেক্ষিতে আমি সংবিধানের সংশোধিত অধ্যাদেশ ৫২/১ ধারা অনুযায়ী সাতটি প্রদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করছি।”

এই ঘোষণা দিয়ে তিনি জনগণকে প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে ঘোরাফেরা না করার অনুরোধ জানান।

জাপানের ৪৭টি প্রদেশের মধ্যে যেসব প্রদেশ জরুরি অবস্থা জারি হয় সেইগুলো হলো, টোকিও, ওসাকা, চিবা, কানাগাওয়া, হিয়োগো, সায়তামা এবং ফুকোওয়াকা।

‘জরুরি অবস্থা’, ধারণা নেই জাপানিদের

প্রথমবারের মত জরুরি অবস্থা জারি হলেও ‘জরুরি অবস্থা’ নিয়ে ধারণা কম জাপানিদের।

রিউচি কানাদমে নামের এক গবেষক বলেন, “সত্যি কথা বলতে কি জরুরি অবস্থা কী, সেই বিষয়ে আমাদের তেমন কোন ধারণা নেই।

“প্রথমবারের মত জরুরি অবস্থা পেলেও আমার কাছে তেমন অদ্ভুত আইন মনে হয়নি। আমরা আমাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারছি। যোগাযোগ ব্যবস্থা আগের মত সচল। বলতে গেলে, আমার কাছে তেমন কোন পার্থক্য মনে হচ্ছে না।”

ওসাকায় বসবাসরত কানামাসি ইয়ানামা নামের একজন বলেন, “বিশ্বের বিভিন্ন দেশ করোনাভাইরাস নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে লকডাউন গেছে। কিন্তু জাপান সরকার সম্ভবত বিশ্ববাসীকে দেখাতে জরুরি অবস্থা চালু করেছে। কোম্পানিগুলো তাদের নিয়মিত উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে।

“অফিসগুলো নিয়মিত কর্মঘণ্টা কিছুটা কমিয়ে আনালেও দেশের অর্থনৈতিক সাম্যবস্থা ধরে রাখতে কাজ অব্যাহত রেখেছে।”

তিনি আরো বলেন, “আমার কাছে মনে হচ্ছে, সরকার যদি করোনাভাইরাস মোকাবেলা করতে লকডাউন ঘোষণা করে, এরপরও মানুষজনকে ঘরে রাখতে পারবে না। কারণ, আমরা কাজ করতে বেশি ভালোবাসি। আর দীর্ঘদিনের কাজ করার অভ্যাসে থাকায় আমাদের জন্য ঘরে বসে থাকা বড়ই কঠিন।”

সুনিচি ইতো নামের এক বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বলেন, “আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসগুলা অনলাইনে নেয়া হচ্ছে। তারপরও গবেষণার কাজে আমাদের প্রতিদিনই ল্যাবে যেতে হচ্ছে।

“বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বলা হয়েছে, যারা অ্যাডভান্স লেভেলের গবেষণায় যুক্ত আছে তারা ল্যাবে কাজ করতে পারবে। তবে বেশি সংখ্যক সদস্য এক সঙ্গে ল্যাবের কাজ করতে পারবে না।”

প্রবাসীরা যা বলছেন

প্রবীর বিকাশ সরকার প্রায় তিন দশক ধরে জাপানে বসবাস করছেন। টোকিওতে বসবাসরত এই প্রবাসী বলেন, “জরুরি অবস্থা সফল হবে মনে হয় না। কারণ মানুষকে ঘরবন্দি করে রাখা ছাড়া উপায় নেই। জাপানের কেন্দ্রীয় সরকার ও টোকিও গভর্নর ভুল করেছেন।

“আরও আগেই টোকিওকে লকডাউন করা উচিত ছিল।এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। মানুষ অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে কাজে যাচ্ছে। আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।”

টোকিও মেডিকেল ও ডেন্টাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আব্দুল্লাহ্ আল মাসুদ খান বলেন, “দশ বছরের প্রবাস জীবনে প্রথমবারের মত জরুরি অবস্থার অভিজ্ঞতা হলো। এখন পর্যন্ত সবই তো খোলা। বাস-ট্রেন নিয়মিত সূচি অনুযায়ী চলছে।

“ইউনিভার্সিটিতে আসি প্রতিদিন। তবে হ্যাঁ, সব জায়গায় লোক কম। এখানে লোকজন সরকার কে বিশ্বাস করে, নির্দেশনা মেনে চলে।”

কাগাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডিতে অধ্যয়নরত দেবু কুমার ভট্টাচার্য বলেন, “জাপানের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হলেও ট্রেন চলছে এবং প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়ারও সুযোগ আছে। জাপানের জনগণ অনেক সভ্য এবং সচেতন, সরকারের নির্দেশ তারা মেনে চলছে তবুও জাপান সরকারের আরেকটু কঠিন পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল বলে আমি মনে করি, কারণ জরুরি অবস্থা ঘোষণার পরেও কিন্তু জাপানে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমেনি বরং বাড়ছে।”

News Source

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *