কানের ময়লা সাফ করার কোনই প্রয়োজন নেই!

বাইরের বাতাস কানে প্রবেশ করে এবং এই বাতাসের সঙ্গে ধূলা-ময়লা-জীবাণুসহ আরো নানা জিনিস কানে প্রবেশ করে। এ সব জিনিস যেনো কানের কোনো ক্ষতি করতে না পারে, সে জন্য কানে তেল জাতীয় এক রকম পদার্থের নিঃসরণ ঘটে। এই পদার্থের নিঃসরণ ঘটে কর্ণ-নালীর ত্বকের ক্ষুদ্র এক জাতীয় গ্লান্ড থেখে। দেহে এ জাতীয় গ্লান্ড বা গ্রন্থি আরো আছে। আমাদের দেহে যে ঘাম বের হয় তাও একটি গ্লান্ড থেকে উৎপন্ন হয়। কানের এই তেল জাতীয় পর্দাথের সঙ্গে বাইরের ময়লা মিশে যে জিনিসের তৈরি হয় তাকে কানের খইল বলা হয়। অর্থাৎ এ ভাবেই বাইরের ময়লাকে কান আটকে দেয়।

কানের খইলের ইংরেজি নাম এয়ার ওয়াক্স। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা একে সিরোমেন বলেন। কানের খইল সাধারণভাবে দুই ধরনের হয়, একটি হলো ভেজা আরেকটি হলো শুকনা। ৮০ শতাংশ মানুষেরই কানের খইল ভেজা থাকে এবং মাত্র ২০ শতাংশ মানুষের কানে শুকনা খইল থাকে।

শুধু মানুষ নয় আরো অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীর কানেও খইল জমতে দেখা যায়।
হলি ফ্যামিলির নাক কান গলা বিভাগের প্রফেসর ড.এস এম খোরশেদ আলম বলেন “আমাদের সবার কানে ময়লা জন্মে। অঞ্চল ভেদে এই ময়লাকে নানা নামে অভিহিত করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি যে শব্দটি ব্যবহার হয় তা হলো কানের খইল।”

আমরা অনেক সময় লঞ্চ ঘাট, ফেরি, বা বাস-রেল স্টেশনে কান পরিষ্কার করছে, এমন পেশার লোক দেখতে পাই। তাদের হাতে থাকে ছোট একটা বাক্স। তাতে নানা জাতীয় রংগিন পর্দাথ থাকে এবং বিচিত্র আওয়াজ করে তার সম্ভাব্য খদ্দেরদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেন। পরে খদ্দের পেলে তাদের কান থেকে ময়লা বের করেন।

প্রফেসর ড.এস এম খোরশেদ আলম বলেন, “কানের ময়লা সাফ করার কোনই প্রয়োজন নেই। কানের ময়লা আপনা থেকেই বের হয়ে যায়। কানের ময়লা ধীরে ধীরে কর্ণ গহবর থেকে এগিয়ে আসে। তারপর তা ঝরে পড়ে যায়।”
এমনটা কেনো হয় তার ব্যাখ্যা দিতে যেয়ে তিনি বলেন, “আমাদের চোয়ালের হাড়ের সঙ্গে কানের সংযোগ রয়েছে। ফলে খাদ্য চিবানো বা নানা কারণে যখনই আমরা কাণ নাড়াচাড়া করি তখনই কানের ভেতরে নাড়া পড়ে এবং জমে থাকা ময়লা ধীরে ধীরে বাইরের দিকে আসতে শুরু করে। একই সঙ্গে কর্ণ-কোষ বৃদ্ধি পায় এবং ময়লাকে বাইরের দিকে ঠেলে দেয়। সব মিলিয়ে কান পরিষ্কার করার কোনো দরকার পড়ে না। বরং কান পরিষ্কার না করলেও তা সবচেয়ে বেশি পরিষ্কার থাকে। অন্যদিকে কান পরিষ্কার করা হলে কানে ফোঁড়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ছাড়া কান পরিষ্কার করার সময় ময়লাকে আরো ভেতরে ঠেলে দেয়া হতে পারে। তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে। অথবা পরিষ্কার করতে গিয়ে কানের পর্দায় খোচা লাগতে পারে বা কানের ভেতরের ত্বক ছিড়ে যেতে পারে, যা বিপদের কারণ হয়ে দেখা দেবে। তবে কান পরিষ্কার করার প্রয়োজন না থাকলেও কানে তেল, সরিষা নারিকেল বা অলিভ তেল দেয়া যেতে পারে। এ সব তেল কানের ময়লা বের করতে সাহায্য করে।”

যাদের কানের খইল শুকনো, তারা যদি অলিভ ওয়েল বা অন্য কোনো তেল কানে দেন, তবে তাতে উপকার পাবেন।

প্রফেসর খোরশেদ বলেন “কানে পানি ঢুকলে তেমন কোনো সমস্যা হয় না। তা বের করারও কোনো প্রয়োজন নেই। দেহের অন্য কোনো স্থানের চেয়ে কানে উষ্ণতা বেশি। কাজেই যদি কোনোভাবে পানি কানে প্রবেশ করে তবে তা কান থেকে বাষ্প হয়ে বের হয়ে যাবে। কানে পানি ঢুকলেও তা থাকতে পারে না। এ ছাড়া বাচ্চাদের কানে ময়লা জমে ব্যথা হয় বলে অনেকে বলে থাকেন। এমন কথাও সাধারণত সত্য নয়। বাচ্চাদের কানে ব্যথা হয় ভিন্ন কোনো কারণে। তবে কোনো কোনো সময় ময়লা জনিত কারণে কানে ব্যথা হতে পারে। তবে সে জন্য ময়লা পরিষ্কার করতে হলে তা করতে হবে একজন নাক কান গলার বিষেশজ্ঞ চিকিৎসককে। একই ভাবে কোনো কোনো সময় কানের ময়লা অনেকের জন্য সংকটের সৃষ্টি করে। সে ক্ষেত্রে কানের ময়লা বা খইল সরানোর প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এ কাজটিও চিকিৎসক ছাড়া আর কারো করা ঠিক হবে না।”

তিনি আরো বলেন, “যে ময়লা নিজে নিজেই কানের ভেতর থেকে পুনরায় কানের মুখ পর্যন্ত চলে এসেছে তাকে ফেলতে গিয়ে কেনো আবার ভেতরের

দিকে ঠেলে দেয়ার ঝুঁকি নেয়া ঠিক নয়। তার চেয়ে তাকে আপনা আপনি পড়ে যাওয়ার সুযোগটি দেয়া উচিত।”

Please follow and like us:
error

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *